Wednesday, February 17, 2016

বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন ও শিক্ষক নেতা আলহাজ্ব মৌলভী ছৈয়দ ছোলতান আহমদ






স্বদেশ প্রেমের মূল্যই বা কি? দেশের জন্য আত্মত্যাগ করে দলে দলে জীবন দিল অনেকেই, তাদের সবারই কি সমান মূল্যায়ন হয়? না, --- হয় নাবৃটিশের অনৈতিক শোষণ, নিপীড়ন, নির্যাতন, অমানবিক আচরণের বিরুদ্ধে সংগঠন, অস্ত্রধরে বিপ্লবী হয়েছেন অনেকেই, জীবন উসর্গও করেছেনস্বাধীন দেশে তাদের সামান্য স্বীকৃতিটুকুও মিলে না

অভাব, অনটন আর দুঃখ কষ্টের মধ্যে সে সব ত্যাগী পুরুষের বংশ পরস্পরায় দিনাতিপাত করে-করছেঅথচ বৃটিশের গোলামী খেটে, বৃটিশের শাসনকে বাহবা দিয়ে, তাদের অত্যাচারকে মাথা পেতে নিয়ে, শোষণ-বঞ্চনাকে স্বীকৃতি যারা দিয়েছে তারা পেয়েছেন অনেক কিছুশত শত লক্ষ কোটি বিঘা জমিসহ জমিদারী, দুচোখ যতদূর যায় ততদূর দাপট চালানোর মত জমির মালিকানা, বিভিন্ন নামের লম্বা লম্বা খেতাবকালীন আইন পরিষদের নির্বাচনে লড়াই করার মত আর্থিক সহায়তাশোষক বৃটিশ শাসক গোষ্ঠীর অত্যাচার নির্যাতনের বিরুদ্ধে সংগঠিত হবার চেষ্টা করলে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের সৈনিকদের দমিয়ে দেয়া হতহামলা, মামলা ও আটক করে নির্যাতন করতেও দ্বিধা করত না বৃটিশ শাসকগোষ্ঠীতাদের এসব অপকর্মের সমর্থন শতভাগ সহযোগিতা দিত শোষক বৃটিশের পা-ছাটা গোলামরা

বৃটিশ শাসক গোষ্ঠীর রোষানলে পড়ে যারা সমগ্র জীবন-যৌবনে নির্যাতিত ও নিপীড়িত হয়েছেন তাদের মধ্যে মরহুম আলহাজ্ব মৌলভী ছৈয়দ ছোলতান ছিলেন অন্যতমতিনি পিতৃপুরুষের ধন সম্পদ যা কিছু ছিল তাও আবার বিলিয়েছেন দেশের শিক্ষা বিস্তারশিড়কদের আন্দোলনের পেছনেমৌলভী ছৈয়দ ছোলতান আহমদ বৃটিশের নানা উপাধি গ্রহণতো দূরের কথা তাদের পোশাক পরিচ্ছেদে ও পছন্দ করতেন নাতাঁর মত প্রকৃত দেশ প্রেমিক নাগরিক, শিড়্গক, শিড়্গকনেতা ও সুসংগঠক বর্তমান সমাজে বিরল১৯৭০ সালের ১৭ই জানুয়ারী ৬৮ বসর বয়সে তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত হন
জন্ম ও পরিচয়ঃ আলহাজ্ব মৌলভী ছৈয়দ ছোলতান আহমদ এর জন্ম ১৯০২ সালের ১৪ ই এপ্রিল সাতকানিয়া উপজেলার সোনাকানিয়া গ্রামের ছৈয়দ বাড়ীতেতাঁর পিতা ছিলেন তকালীন খেলাফত আন্দোলনের একনিষ্ঠ কর্মী মরহুম আলহাজ্ব মওলানা ছৈয়দ আলিম উলস্নাহ শাহ্‌মায়ের নাম লতিফা খাতুনছৈয়দ ছোলতান একদিকে বৃটিশের বিরম্নদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামের কারাবরণকারী সৈনিক অন্যদিকে প্রাথমিক শিড়্গক সমাজের সুযোগ সুবিধা ও দাবী আদায়ের লড়্গে সারাজীবন সংগ্রাম করেছেননিপীড়িত নিগৃহীত ও নির্যাতিত হয়েছেনএ ছাড়া তিনি নিরলস পরিশ্রমী সফল সংগঠক ও সমাজ সেবী ছিলেন








মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ও মহাকবি ইসমাইল হোসেন সিরাজীর নির্দেশে তিনি শিক্ষাব্রত হিসেবে গ্রহণ করেনমরহুম মৌলভী ছৈয়দ ছোলতান আহমদ ১৯২৭ সালে চট্টগ্রাম জেলা প্রাথমিক শিড়্গক সমিতি গঠন করেন ও এর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হনএর পর থেকে তাঁর চিন্তা শুরু হয় সমগ্র উপমহাদেশের শিক্ষকদের কল্যাণের লক্ষে শিক্ষকদের সংগঠিত করার জন্য১৯৩২ সালকলিকাতায় চলছিল অলইন্ডিয়া কংগ্রেসের সম্মেলনে যোগদেনসম্মেলনের এক ফাঁকে পূর্ব পরিকল্পনা মত শিড়্গকের নিয়ে সমাবেশ করেন এবং নিখিল বঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি গঠন করেনসমাবেশ শেষে সর্ব সম্মতিক্রমে শেরে বাংলা এ, কে, ফজলুল হক সভাপতি, স্যার আজিজুল হক সহসভাপতি ও মরহুম মৌলভী ছৈয়দ ছোলতান আহমদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হনএবার তার স্বপ্ন জাতীয় পর্যায়ে বাসত্মবায়নের দিকে পা বাড়ায়শিড়্গক সমিতির ব্যানারে সংগঠিত হয়ে জাতীয় পর্যায়ে উপমহাদেশের শিড়্গক সমাজের নিকট নিজেদের সমস্যা চিহ্নিত ও সমাধানের উপায় নির্ধারণ ও শিড়্গা প্রদানের ড়্গেত্রে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেনমরহুম ছৈয়দ ছোলতান ১৯২৬ সালে নিজ গ্রামে মাদার্শা সোনাকানিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেনতিনি দীর্ঘদিন এ স্কুলের প্রধান শিড়্গকের পদও অলংকৃত করেন

১৯৬৪ ও ১৯৫১ সালে তিনি দেশব্যাপী শিক্ষক ধর্মঘটে নেতৃত্ব দেন১৯৪৭ সালে তকালীন পূর্ব পাকিসত্মান প্রাথমিক শিড়্গক সমিতির সিনিয়র সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন১৯৫০ সালে চট্টগ্রাম জেলা প্রাথমিক শিড়্গক সমিতির সভাপতি ও জেলা স্কুল বোর্ডের সদস্য নির্বাচিত হন১৯৫২ সালে চট্টগ্রামে পূর্ব পাকিসত্মান প্রাথমিক শিড়্গক সম্মেলন আহ্বান করেনযার উদ্বোধক ছিলেন শেরে বাংলা এ, কে, ফজলুল হক৫২সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের স্বপড়্গে দেশব্যাপী শিড়্গক সমাজের মাঝে ব্যাপক প্রচারণা চালান ও ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন সভা ও সমাবেশে যোগদেনএকদিকে শিক্ষকদের নিয়ে আন্দোলন অন্যদিকে দেশ প্রেমিক রাজনীতিক হওয়ায় বৃটিশ সরকারের বদ নজরে ছিলেন১৯৪৪-৪৫ সালে মওলানা ইসলামাবাদী, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর নেতৃত্বে ভারতের স্বাধীনতার লড়্গ্যে এক গোপন সরকার গঠিত হয়মৌলভী ছৈয়দ ছোলতান আহমদ ছিলেন এই গোপন সরকারে মন্ত্রীসভার একজন সদস্যআবার, আজাদ হিন্দু ফৌজের বিপস্নবী কমিটিরও নেতৃত্ব দেনএসব কারণে বৃটিশ সরকারের রোষানলে পড়ে ১৯৪৪ সালে তাকে ১০ মাস কলিকাতা ও রংপুরে কারাবরণ করতে হয়

পরবর্তীতে ও দীর্ঘকাল তাকে গৃহ থেকে দূরে থাকতে হয়েছে শিড়্গকদের দাবী ও রাজনীতির কারণে তিনি নিখিল বঙ্গ কংগ্রেস, জমিয়তে ওলামা ও কৃষক প্রজা পার্টির অন্যতম সংগঠক ছিলেনচট্টগ্রাম কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানা, সাতকানিয়া সরকারী কলেজ, দেওদীঘি হাইস্কুল, মির্জাখীল হাইস্কুল প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় অংশ নেনতিনি চট্টগ্রাম জেলা প্রাথমিক শিড়্গক সমবায় সমিতি, ফকির মাওলানা হাঙ্গর খাল সমবায় সেচ সমিতি, সোনাকানিয়া ইউনিয়ন বহুমুখী সমবায় সমিতি ও বাংলাদেশ (পূর্ব পাকিসত্মান) সমাজ কল্যাণ সমিতি গঠন করেনদেশ, মাটি ও মানুষের প্রতি কল্যাণ সাধন ছিল তার জীবনের মূল লড়্গ্যসারাজীবন খদ্দের কাপড় পরিধান করতেন তিনি

দেশীয় খদ্দর কাপড় ছাড়া কখনও বিদেশী কাপড় পরিধান করতেন না১৯৪৬ সালে সংসদ নির্বাচনে বৃহত্তম সাতকানিয়া আসন থেকে মনোনয়ন পত্র পেশ করেন কিন্ত কংগ্রেস এর কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশে মনোনয়ন পত্র প্রত্যাহার করে নেন এবং পটিয়া আসনের প্রার্থী মওলানা মনিরম্নজ্জামান ইসলামাবাদীর পড়্গে নির্বাচনী কাজে অংশ নেন১৯৪৭ সালে তিনি পবিত্র হজ্ব আদায় করেন

মরহুম আলহাজ্ব মৌলভী ছৈয়দ ছোলতান আহমদ ৩ পুত্র ও ১ কন্যা সনত্মানের জনক ছিলেন১ম পুত্র মরহুম মুফতী ছৈয়দ মোস্তফা কামাল এশিয়া টাঙ্গাইলস্থ মওলানা ভাসানী প্রতিষ্ঠিত সনেত্মাষ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক রেক্টর, ২য় পুত্র মরহুম সাংবাদিক ছৈয়দ মোসত্মফা জামাল ও ৩য় পুত্র ছৈয়দ মোস্তফা আইয়ুব একজন স্কুল শিক্ষককন্যা দিলু খাতুন একজন গৃহিনী


সাংবাদিকতাঃ শিক্ষকতা ও রাজনীতির পাশাপাশি তিনি কলকাতা, রেঙ্গুন ও ঢাকার পত্রিকায় নিয়মিত সংবাদ পাঠাতেন১৯৭০ সালের ১৭ ই জানুয়ারী নিজ গ্রামের বাড়ীতে ইন্তেকাল করেনসোনাকানিয়া গ্রামের ছৈয়দ ছোলতান পাড়াস্থ মনজিলের দরগাহ নামকস্থানে কাতাল পীর (রঃ) মাজার সংলগ্নে তাকে সমাহিত করা হয়


পূর্বপুরুষঃ ধর্মপ্রচার করার লড়্গ্যে বসতি স্থাপন পূর্বক মানুষকে ধর্মানত্মর করার কর্মসূচী চলাকালে মূল কাতাল পীর (রঃ) এর বংশধর বা ভাগিনা ১ জন সাতকানিয়া উপজেলার সোনাকানিয়া গ্রামের মনজিলের দরগাহ নামক স্থানে শহীদ হন১৩০০ সালের ঘটনাফজরের নামাজের সময় যুবক যুবতীরা তাঁকে কতল করেনএ ঘটনার ৩শ বসর পর ১৬শ সালের প্রথম দিকে দিলস্নীর বাদশাহ জাহাঙ্গীরের আমলে আলস্নামা আতি উলস্নাহ বিন সৈয়দ মুসা নামের এক ব্যক্তিকে লাখেরাজ সম্পত্তি দিয়ে শহীদ কাতাল পীর (রহঃ) মাজার স্থলে ধর্ম প্রচার, মসজিদ, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রেরণ করা হয়আল্লামা আতি উল্লাহ বিন ছৈয়দ মুসা সৌদিআরব, তুরস্ক, আফগানিস্তান ও ভারত হয়ে বাংলাদেশে আগমন করেনতারই বংশধর মরহুম আলহাজ্ব মৌলভী ছৈয়দ ছোলতান আহমদ
লেখক:।। সৈয়দ গোলাম নবী।।

No comments:

Post a Comment