Wednesday, February 17, 2016

Article




বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন ও শিক্ষক নেতা আলহাজ্ব মৌলভী ছৈয়দ ছোলতান আহমদ






স্বদেশ প্রেমের মূল্যই বা কি? দেশের জন্য আত্মত্যাগ করে দলে দলে জীবন দিল অনেকেই, তাদের সবারই কি সমান মূল্যায়ন হয়? না, --- হয় নাবৃটিশের অনৈতিক শোষণ, নিপীড়ন, নির্যাতন, অমানবিক আচরণের বিরুদ্ধে সংগঠন, অস্ত্রধরে বিপ্লবী হয়েছেন অনেকেই, জীবন উসর্গও করেছেনস্বাধীন দেশে তাদের সামান্য স্বীকৃতিটুকুও মিলে না

অভাব, অনটন আর দুঃখ কষ্টের মধ্যে সে সব ত্যাগী পুরুষের বংশ পরস্পরায় দিনাতিপাত করে-করছেঅথচ বৃটিশের গোলামী খেটে, বৃটিশের শাসনকে বাহবা দিয়ে, তাদের অত্যাচারকে মাথা পেতে নিয়ে, শোষণ-বঞ্চনাকে স্বীকৃতি যারা দিয়েছে তারা পেয়েছেন অনেক কিছুশত শত লক্ষ কোটি বিঘা জমিসহ জমিদারী, দুচোখ যতদূর যায় ততদূর দাপট চালানোর মত জমির মালিকানা, বিভিন্ন নামের লম্বা লম্বা খেতাবকালীন আইন পরিষদের নির্বাচনে লড়াই করার মত আর্থিক সহায়তাশোষক বৃটিশ শাসক গোষ্ঠীর অত্যাচার নির্যাতনের বিরুদ্ধে সংগঠিত হবার চেষ্টা করলে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের সৈনিকদের দমিয়ে দেয়া হতহামলা, মামলা ও আটক করে নির্যাতন করতেও দ্বিধা করত না বৃটিশ শাসকগোষ্ঠীতাদের এসব অপকর্মের সমর্থন শতভাগ সহযোগিতা দিত শোষক বৃটিশের পা-ছাটা গোলামরা

বৃটিশ শাসক গোষ্ঠীর রোষানলে পড়ে যারা সমগ্র জীবন-যৌবনে নির্যাতিত ও নিপীড়িত হয়েছেন তাদের মধ্যে মরহুম আলহাজ্ব মৌলভী ছৈয়দ ছোলতান ছিলেন অন্যতমতিনি পিতৃপুরুষের ধন সম্পদ যা কিছু ছিল তাও আবার বিলিয়েছেন দেশের শিক্ষা বিস্তারশিড়কদের আন্দোলনের পেছনেমৌলভী ছৈয়দ ছোলতান আহমদ বৃটিশের নানা উপাধি গ্রহণতো দূরের কথা তাদের পোশাক পরিচ্ছেদে ও পছন্দ করতেন নাতাঁর মত প্রকৃত দেশ প্রেমিক নাগরিক, শিড়্গক, শিড়্গকনেতা ও সুসংগঠক বর্তমান সমাজে বিরল১৯৭০ সালের ১৭ই জানুয়ারী ৬৮ বসর বয়সে তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত হন
জন্ম ও পরিচয়ঃ আলহাজ্ব মৌলভী ছৈয়দ ছোলতান আহমদ এর জন্ম ১৯০২ সালের ১৪ ই এপ্রিল সাতকানিয়া উপজেলার সোনাকানিয়া গ্রামের ছৈয়দ বাড়ীতেতাঁর পিতা ছিলেন তকালীন খেলাফত আন্দোলনের একনিষ্ঠ কর্মী মরহুম আলহাজ্ব মওলানা ছৈয়দ আলিম উলস্নাহ শাহ্‌মায়ের নাম লতিফা খাতুনছৈয়দ ছোলতান একদিকে বৃটিশের বিরম্নদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামের কারাবরণকারী সৈনিক অন্যদিকে প্রাথমিক শিড়্গক সমাজের সুযোগ সুবিধা ও দাবী আদায়ের লড়্গে সারাজীবন সংগ্রাম করেছেননিপীড়িত নিগৃহীত ও নির্যাতিত হয়েছেনএ ছাড়া তিনি নিরলস পরিশ্রমী সফল সংগঠক ও সমাজ সেবী ছিলেন








মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ও মহাকবি ইসমাইল হোসেন সিরাজীর নির্দেশে তিনি শিক্ষাব্রত হিসেবে গ্রহণ করেনমরহুম মৌলভী ছৈয়দ ছোলতান আহমদ ১৯২৭ সালে চট্টগ্রাম জেলা প্রাথমিক শিড়্গক সমিতি গঠন করেন ও এর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হনএর পর থেকে তাঁর চিন্তা শুরু হয় সমগ্র উপমহাদেশের শিক্ষকদের কল্যাণের লক্ষে শিক্ষকদের সংগঠিত করার জন্য১৯৩২ সালকলিকাতায় চলছিল অলইন্ডিয়া কংগ্রেসের সম্মেলনে যোগদেনসম্মেলনের এক ফাঁকে পূর্ব পরিকল্পনা মত শিড়্গকের নিয়ে সমাবেশ করেন এবং নিখিল বঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি গঠন করেনসমাবেশ শেষে সর্ব সম্মতিক্রমে শেরে বাংলা এ, কে, ফজলুল হক সভাপতি, স্যার আজিজুল হক সহসভাপতি ও মরহুম মৌলভী ছৈয়দ ছোলতান আহমদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হনএবার তার স্বপ্ন জাতীয় পর্যায়ে বাসত্মবায়নের দিকে পা বাড়ায়শিড়্গক সমিতির ব্যানারে সংগঠিত হয়ে জাতীয় পর্যায়ে উপমহাদেশের শিড়্গক সমাজের নিকট নিজেদের সমস্যা চিহ্নিত ও সমাধানের উপায় নির্ধারণ ও শিড়্গা প্রদানের ড়্গেত্রে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেনমরহুম ছৈয়দ ছোলতান ১৯২৬ সালে নিজ গ্রামে মাদার্শা সোনাকানিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেনতিনি দীর্ঘদিন এ স্কুলের প্রধান শিড়্গকের পদও অলংকৃত করেন

১৯৬৪ ও ১৯৫১ সালে তিনি দেশব্যাপী শিক্ষক ধর্মঘটে নেতৃত্ব দেন১৯৪৭ সালে তকালীন পূর্ব পাকিসত্মান প্রাথমিক শিড়্গক সমিতির সিনিয়র সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন১৯৫০ সালে চট্টগ্রাম জেলা প্রাথমিক শিড়্গক সমিতির সভাপতি ও জেলা স্কুল বোর্ডের সদস্য নির্বাচিত হন১৯৫২ সালে চট্টগ্রামে পূর্ব পাকিসত্মান প্রাথমিক শিড়্গক সম্মেলন আহ্বান করেনযার উদ্বোধক ছিলেন শেরে বাংলা এ, কে, ফজলুল হক৫২সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের স্বপড়্গে দেশব্যাপী শিড়্গক সমাজের মাঝে ব্যাপক প্রচারণা চালান ও ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন সভা ও সমাবেশে যোগদেনএকদিকে শিক্ষকদের নিয়ে আন্দোলন অন্যদিকে দেশ প্রেমিক রাজনীতিক হওয়ায় বৃটিশ সরকারের বদ নজরে ছিলেন১৯৪৪-৪৫ সালে মওলানা ইসলামাবাদী, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর নেতৃত্বে ভারতের স্বাধীনতার লড়্গ্যে এক গোপন সরকার গঠিত হয়মৌলভী ছৈয়দ ছোলতান আহমদ ছিলেন এই গোপন সরকারে মন্ত্রীসভার একজন সদস্যআবার, আজাদ হিন্দু ফৌজের বিপস্নবী কমিটিরও নেতৃত্ব দেনএসব কারণে বৃটিশ সরকারের রোষানলে পড়ে ১৯৪৪ সালে তাকে ১০ মাস কলিকাতা ও রংপুরে কারাবরণ করতে হয়

পরবর্তীতে ও দীর্ঘকাল তাকে গৃহ থেকে দূরে থাকতে হয়েছে শিড়্গকদের দাবী ও রাজনীতির কারণে তিনি নিখিল বঙ্গ কংগ্রেস, জমিয়তে ওলামা ও কৃষক প্রজা পার্টির অন্যতম সংগঠক ছিলেনচট্টগ্রাম কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানা, সাতকানিয়া সরকারী কলেজ, দেওদীঘি হাইস্কুল, মির্জাখীল হাইস্কুল প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় অংশ নেনতিনি চট্টগ্রাম জেলা প্রাথমিক শিড়্গক সমবায় সমিতি, ফকির মাওলানা হাঙ্গর খাল সমবায় সেচ সমিতি, সোনাকানিয়া ইউনিয়ন বহুমুখী সমবায় সমিতি ও বাংলাদেশ (পূর্ব পাকিসত্মান) সমাজ কল্যাণ সমিতি গঠন করেনদেশ, মাটি ও মানুষের প্রতি কল্যাণ সাধন ছিল তার জীবনের মূল লড়্গ্যসারাজীবন খদ্দের কাপড় পরিধান করতেন তিনি

দেশীয় খদ্দর কাপড় ছাড়া কখনও বিদেশী কাপড় পরিধান করতেন না১৯৪৬ সালে সংসদ নির্বাচনে বৃহত্তম সাতকানিয়া আসন থেকে মনোনয়ন পত্র পেশ করেন কিন্ত কংগ্রেস এর কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশে মনোনয়ন পত্র প্রত্যাহার করে নেন এবং পটিয়া আসনের প্রার্থী মওলানা মনিরম্নজ্জামান ইসলামাবাদীর পড়্গে নির্বাচনী কাজে অংশ নেন১৯৪৭ সালে তিনি পবিত্র হজ্ব আদায় করেন

মরহুম আলহাজ্ব মৌলভী ছৈয়দ ছোলতান আহমদ ৩ পুত্র ও ১ কন্যা সনত্মানের জনক ছিলেন১ম পুত্র মরহুম মুফতী ছৈয়দ মোস্তফা কামাল এশিয়া টাঙ্গাইলস্থ মওলানা ভাসানী প্রতিষ্ঠিত সনেত্মাষ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক রেক্টর, ২য় পুত্র মরহুম সাংবাদিক ছৈয়দ মোসত্মফা জামাল ও ৩য় পুত্র ছৈয়দ মোস্তফা আইয়ুব একজন স্কুল শিক্ষককন্যা দিলু খাতুন একজন গৃহিনী


সাংবাদিকতাঃ শিক্ষকতা ও রাজনীতির পাশাপাশি তিনি কলকাতা, রেঙ্গুন ও ঢাকার পত্রিকায় নিয়মিত সংবাদ পাঠাতেন১৯৭০ সালের ১৭ ই জানুয়ারী নিজ গ্রামের বাড়ীতে ইন্তেকাল করেনসোনাকানিয়া গ্রামের ছৈয়দ ছোলতান পাড়াস্থ মনজিলের দরগাহ নামকস্থানে কাতাল পীর (রঃ) মাজার সংলগ্নে তাকে সমাহিত করা হয়


পূর্বপুরুষঃ ধর্মপ্রচার করার লড়্গ্যে বসতি স্থাপন পূর্বক মানুষকে ধর্মানত্মর করার কর্মসূচী চলাকালে মূল কাতাল পীর (রঃ) এর বংশধর বা ভাগিনা ১ জন সাতকানিয়া উপজেলার সোনাকানিয়া গ্রামের মনজিলের দরগাহ নামক স্থানে শহীদ হন১৩০০ সালের ঘটনাফজরের নামাজের সময় যুবক যুবতীরা তাঁকে কতল করেনএ ঘটনার ৩শ বসর পর ১৬শ সালের প্রথম দিকে দিলস্নীর বাদশাহ জাহাঙ্গীরের আমলে আলস্নামা আতি উলস্নাহ বিন সৈয়দ মুসা নামের এক ব্যক্তিকে লাখেরাজ সম্পত্তি দিয়ে শহীদ কাতাল পীর (রহঃ) মাজার স্থলে ধর্ম প্রচার, মসজিদ, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রেরণ করা হয়আল্লামা আতি উল্লাহ বিন ছৈয়দ মুসা সৌদিআরব, তুরস্ক, আফগানিস্তান ও ভারত হয়ে বাংলাদেশে আগমন করেনতারই বংশধর মরহুম আলহাজ্ব মৌলভী ছৈয়দ ছোলতান আহমদ
লেখক:।। সৈয়দ গোলাম নবী।।

সাংবাদিক ও ভাষাসৈনিক সৈয়দ মোস্তফা জামাল স্মরণে






ভাষা সৈনিক, প্রচার বিমুখ প্রয়াত সাংবাদিক, সমাজসেবক ছৈয়দ মোস্তফা জামাল ২০০৪ সালের ২২ এপ্রিল আমাদের শোক সাগরে ভাসিয়ে চিরতরে চলে গেলেন। আমি তাহার ৮ম মৃত্যু বার্ষিকীতে রূহের মাগফেরাত কামনা করছি। আল্লাহ যেন তাকে মা ও বেহেস্ত নসিব করুন।  ঢাকাস্থ চট্টগ্রাম সমিতির সাবেক কর্মকতা ও পটিয়া উপজেলার শোভন দন্ডীর প্রয়াত শিাবিদ ও কবি ওয়ালি মিঞা মাষ্টার ’চট্টগ্রাম সমিতি ও সৈয়দ মোস্তফা জামালকে’ নিয়ে  কবিতা লিখেছেন -


“ছৈয়দ মোস্তফা জামাল খাটেন বহুতর,
সমিতির কাজে তিনি যান ঘরে ঘর।
সেক্রেটারীর গুরুভার তিনি বহন করে,
দায়িত্ব পালন করেছেন, তিনি চার বৎসর ধরে।
সমাজকর্মী ছৈয়দ ছোলতান, জামাল তাঁর ছেলে
বসতি দেখবেন আছে মির্জাখীলে গেলে,
প্রাথমিক শিকদের খেদমত করিয়া
সত্তর বছর বয়স তাঁর গেল কাটিয়া।
জনাব ছোলতানের ছিল পর হিতে মন,
তাইত জামাল পিতারমত সমাজকর্মী হন ॥”

সৈয়দ মোস্তফা জামালের পেশা সাংবাদিকতা হলেও এ পেশাকে পরিপূর্ণভাবে আর্তমানবতার সেবায় তিনি কাজে লাগান। সাংবাদিকতার পাশাপাশি সমাজ সেবার জন্য যুগ যুগ ধরে সৈয়দ মোস্তফা জামাল মানুষের অন্তরে বেঁচে থাকবেন। সৎ সাংবাদিকতা ও নিষ্ঠার সাথে সমাজসেবার কারণে আর্থিক টানা পোড়নের জন্য তিনি কোন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে যেতে পারেননি। সৎ মানুষের জন্য যথাসাধ্য কল্যাণ করার আজীবন চেষ্টা করেছেন। তিনি বলতেন, ‘‘বঞ্চিত নিপীড়িত মানুষের সমস্যাদি চিহ্নিত, তাদের বক্তব্য সংবাদপত্রের মাধ্যমে সমাজে তুলে ধরা সম্ভব হলে মহান আল্লাহর নিকট সওয়াব ও রহমত পাওয়া যায়।’’

প্রকৃতপে সাংবাদিকতা একটি মহৎ ও সম্মানী পেশা। যার আসল উদ্দেশ্যই হচ্ছে সমস্ত প্রাণীকুলের সমস্যাদি চিহ্নিতকরণ এবং সমাধানের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা। দেশ ও জাতির প্রতি কর্তব্য পরায়নতা, রাজনৈতিক পরিমন্ডলে জাতীয় নেতৃবৃন্দকে কর্তব্যের প্রতি সচেতন রাখার জন্য, রবুরিয়ত কায়েম, সর্বোপরি স্বীয় পিতার আদর্শ অনুকরণে জাতীয় রাজনীতির সাথেও সৈয়দ মোস্তফা জামাল সংশ্লিষ্ট ছিলেন। মাওলানা ভাসানীর পথ ধর, রবুবিয়ত কায়েম করার শ্লোগানে উজ্জীবিত ছিলেন আজীবন। তিনি ন্যাপ(ভাসানীর)বিভিন্ন পদে দীর্ঘ সময় সক্রিয় দায়িত্ব পালন করেন।

ছৈয়দ মোস্তফা জামাল আতœজীবনী লিখেন ১৯৯৭ সালে। ভূমিকায় লিখা ছিলেন নিম্মরূপঃ “সকল প্রশংসা আল্লাহ্তালার। লাখ লাখ দরুদ ও সালম সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ পয়গম্বর হজরত মোহাম্মদ মোস্তফা (সঃ) এর প্রতি। আল্লাহ্্ সকলের গুনাহ্ মাফ করুন এবং আমরা যেন প্রত্যেকে প্রত্যেকের হক আদায় করি এবং মাফ করে দেয়ার তওফিক দিন। আমিন”। তার পূর্ব পুরুষ সৗদি আরব,ইরাক, তুরস্ক,আফগানিস্তান হয়ে দিল্লী  ও ঢাকায় বসবাস করতেন। দিল্লীর বাদশাহ্ জাহাঙ্গীরের আমলে চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া উপজেলার সোনাকানিয়া গ্রামে হযরত কাতাল পীর শাহ্ (রঃ) এর প্রতিষ্ঠিত মসজিদ, মাদ্রাসা ও সমাজ কল্যাণ কেন্দ্রের মাধ্যমে জনসেবার জন্য তাঁর পূর্ব পুরুষ লাখরাজ সম্পত্তি লাভ করেন।

সাংবাদিক ও সমাজসেবক সৈয়দ মোস্তফা জামাল জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৪ সালের ৮ ই জানুয়ারী সোমবার পবিত্র রমজান মাসে। তার দাদা ছৈয়দ আলিম উল্লাহ্ শাহ্ ভারতীয় উপমহাদেশ ্ও আরাকানে ইসলাম প্রচারের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি খেলাফত আন্দোলনের একজন সক্রিয় নেতা ছিলেন এবং বিখ্যাত ছৈয়দ আহমদ বেরেলভীর অনুসারীদের সাথে পবিত্র হজ্ব আদায় করেন।

তাঁর বাবা ছিলেন কোলকাতাস্থ নিখিলবঙ্গ প্রাথমিক শিক সমিতির প্রথম সাধারণ সম্পাদক ও বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের কারাবরণকারী নেতা মরহুম আলহাজ্ব মৌলভী ছৈয়দ ছোলতান আহমদ।

১৯৫১ সালে সৈয়দ মোস্তফা জামাল তমদ্দুন মজলিশের বৃহত্তম সাতকানিয়া থানার সাধারণ সম্পাদক নিবার্চিত হন। এ বৎসর সাতকানিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের ছাত্র মিলনায়তন সম্পাদক পদেও তিনি নির্বাচিত হন। ১৯৫১ সালে ঢাকার ভাষা আন্দোলনের মুখপত্র সাপ্তাহিক সৈনিক এর সাতকানিয়া প্রতিনিধি হিসেবে সাংবাদিকতা পেশায় জড়িয়ে পড়েন।

১৯৫২ সালে বৃহত্তর সাতকানিয়া থানার রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির আন্দোলনের আহবায়কের দায়িত্ব পালন করেন। ঐ সময় ব্যাপক মিছিল সভা, অবরোধ কর্মসূচী পালন এবং রাষ্ট্রভাষা বাংলা এর পে সক্রিয় প্রচার চালান। সাতকানিয়ার আহবায়ক হিসেবে ঢাকায় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ ও এপ্রিল মাসে ঢাকায় ভাষা সম্মেলনে অংশ নেন। ঐ সময় তখনকার সদস্য কারামুক্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে চট্টগ্রামসহ ভাষা আন্দোলন বিষয়ে মত বিনিময় করেন। এই সালে শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক চট্টগ্রামে পূর্ব পাকিস্তান প্রাথমিক শিক সম্মেলন উদ্বোধন করেন। সম্মেলনের সংগঠক পিতা মৌলভী ছৈয়দ ছোলতান আহমদের সাথে তিনি সর্বন কাজ করেন।

সৈয়দ মোস্তফা জামাল ১৯৫৪ সালে জেলা যুক্ত ফ্রন্ট কমিটির সহ-প্রচার সম্পাদক নির্বাচিত হন। প্রচার সম্পাদক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক ডঃ মাহফুজুল হক। মরহুম ডঃ মাহফুজুল হকের নেতৃত্বে ১৯৫৪ সালে শেরে বাংলার সাথে সাাৎ করে চট্টগ্রাম থেকে একজন মন্ত্রী নিতে অনুরোধ করেন। ১৯৫২ সালে দৈনিক আজান, ১৯৫৩ সালে দৈনিক সংবাদ, ১৯৫৪ সালে ঢাকায় দৈনিক মিল্লাত ও সপ্তাহিক সৈনিক এ সহ-সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৫৮ সালে দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক নাজাত, ১৯৫৯ সালে দৈনিক ইত্তেহাদ,দৈনিক পয়গামের সহ-সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭২ সালে দৈনিক স্বদেশ এর বার্তা সম্পাদক ও বার্তা সংস্থা সি.পি. আই ও দৈনিক ইত্তেফাকে
কাজ করেন। ১৯৫৭ সালে তিনি পাকিস্তান কিশোর মজলিশ গঠন করেন। মওলানা মোহাম্মদ বজলুল রহিম, শিল্পী হাসান রেজা, ডাঃ ফখরুল ইসলাম চৌধুরী, ব্যাংকার এ.কে.এম মহিউদ্দিন খোকন ঐকমিটির সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি ১৯৬০ সালে দৈনিক আজাদীর ঢাকা ব্যুরো প্রধান নিযুক্ত হন। এ সময় ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সংবাদদাতা ইউনিটের উপ প্রধান ছিলেন। সাংবাদিক হিসেবে ১৯৬২ সালে পাকিস্তানের রাওয়াল পিন্ডিতে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আয়ুব খাঁনের অভিষেক অনুষ্ঠানে যোগ দেন এবং পাক-ভারতের বিরোধপূর্ণ এলাকা মারি, মোজাফ্ফারাবাদ ও কাশ্মীর সফর করেন। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের লাহোরে সমাজ সেবা সম্মেলনে অংশ নেন। ১৯৬৭ সাল থেকে ৪ দফায় ঢাকাস্থ চট্টগ্রাম সমিতির সাধারন সম্পাদক ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালে সংবাদপত্রের প্রকাশনা বন্ধ থাকায় তিনি প্রথমে রংপুরের বুড়িমারি সীমান্তপথে ভারতের দক্ষিণ ২৪পরগণা জেলা,কোলকাতা এবং মেঘালয় রাজ্যে এবং আগরতলায় অবস্থান করেন।

সৈয়দ মোস্তফা জামাল ছিলেন নিরহংকার ও নিবেদিতপ্রাণ বিরল সমাজসেবী, জাতীয় অধ্যাপক ডাঃ নুরুল ইসলাম তাঁর সময়ে চট্টগ্রাম সমিতির সভাপতির পদ অলংকৃত করেন। ঢাকাস্থ যক্ষ্মা সমিতিরও কার্যকারী কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি। ১৯৭৩ সালে চট্টগ্রামে সাতকানিয়া কচি কাঁচার মেলা গঠন করেন। ৭৪ সালে এর সম্মেলন হয়। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭৭ সালে চট্টগ্রামের দৈনিক পূর্বতারায় যোগ দেন।
১৯৮০ সালে অবিভক্ত বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সহকারী মহাসচিব নির্বাচিত হন। এ সময় মাওলানা ইসলামাবাদী একাডেমী গঠিত হলে ব্যারিষ্টার বজলুস সাত্তার সভাপতি, মোস্তফা জামাল সাধারণ সম্পাদক এবং চট্টগ্রাম সাংবাদিক হাউজিং সোসাইটির উদ্যোক্তা পরিচালক নির্বাচিত হন।

তিনি চট্টগ্রাম প্রেস কাব ও চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন (সিইউজে)’র সদস্য, দৈনিক পূর্বতারার সাবেক বার্তা সম্পাদক ছিলেন। তিনি সাতকানিয়া সাহিত্য বিশারদ কচি কাঁচার মেলার প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক। বাংলাদেশ সীরাত মিশন চট্টগ্রাম জেলা শাখার সভাপতি,বিচারপতি আমীরুল কবির চৌধুরী প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমাজ কল্যাণ সমিতির সহ-সভাপতি। ১৯৬০ সাল থেকে জাতীয় প্রেসকাবের সদস্য ছিলেন। তিনি ঢাকার বাংলা কলেজের গভর্নিং বড়ির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। কবি কায়কোবাদ সাহিত্য মজলিশের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তিনি আলেমা খাতুন ভাসানীর নেতৃত্বধীন ন্যাপ ভাসানীর সাবেক কেন্দ্রীয় শিা ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক। চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় ঈদ জামাত কমিটির সাবেক প্রচার সম্পাদক, প্রাচীণ সমাজ উন্নয়ন সঙগঠন বাংলাদেশ সমাজ কল্যাণ সমিতি(বিএসকেএস)র সহ-সভাপতি,সাধারণ সম্পাদক, চকবাজার আজিজুর রহমান জনকল্যাণ পরিষদ, সমাজ কল্যাণ ত্রাণ কমিটি, অপরাধী সংশোধন সংস্থা, আলহাজ্ব নুর মোহাম্মদ সওদাগর আলকাদেরী (রঃ) স্মৃতি সংসদের সদস্য, ডঃ মাহফুজুল হক স্মৃতি সংসদের প্রতিষ্ঠাতা সহ-সভাপতি, কবি আলাদীন আলীনুর সাহিত্য সংসদের সম্পাদক, বাংলাদেশ দ্বীনি একাডেমী এবং খোলাফত আলা মিনহাজিন নবুয়াত সদস্য ছিলেন। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি মাওলানা মনিরুজ্জান ইসলামাবদী গবেষণা একাডেমীর সভাপতি ছিলেন। তিনি শাহ মোহাম্মদ বদিউল আলম, মঘীস্থানে (দণি চট্টগ্রাম) ইসলাম প্রচার, মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ও ডক্টর এম মাহফুজূল হক পুস্তকের লেখক। তিনি ২০০১ সালে শেরে বাংলা জাতীয় পুরষ্কার লাভ করেন। একই সালে ঢাকাস্থ চট্টগ্রাম সমিতি, সমিতিতে অসমান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ সমিতির সম্মাননা পদক লাভ করেন।

সাংবাদিকতায় কৃতিত্ব পূর্ণ অবদানের জন্য ২০০১ সালে বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি তাঁকে স্বর্ণ পদকে ভুষিত করেন, ২০১০ সালে মরনত্তোর সাংবাদিক সফিউদ্দিন আহমদ পদক পান। তিনি ১৯৯১ সালে ন্যাপ ভাসানীর পে চট্টগ্রাম মহানগর (চট্ট- ৯), ১৯৯৬ সালে চন্দনাইশ ও ২০০১ সালে সাতকানিয়া- লোহাগাড়া আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। সাংবাদিকতা জীবনে তিনি অসংখ্যবার প্রেস ইনষ্টিটিউটের প্রশিণে অংশগ্রহণ করেন। প্রবীণ বয়সেও প্রশিণে অংশ নিতে দ্বিধা করতেন না। ২০০৩ সালের প্রথম দিনে উচ্চরক্ত চাপ, জ্বর, ডায়াবেটিস, প্রষ্টেট গ্লাান্ডের আকৃতি বড় হওয়া ইত্যাদি রোগের কারণে হাসপাতালে ভর্তি হন। দীর্ঘ আড়াই মাস হাসপাতালে কাটিয়ে বাসায় ফিরলেও প্রচন্ড শারীরিক দুর্বলতার কারণে শয্যাশায়ী থেকে যান। তখন আর সভা-সমাবেশে যেতে পারেন নি। টানা ১ বছর ১ মাস ১১ দিন চট্টগ্রাম শহরের পাঠানটুলীস্থ বাসভবনে চিকিৎসাধীন থাকার পর তিনি ২২ এপ্রিল ২০০৪ বৃহস্পতিবার রাত ৮ টা ৫ মিনিটে শেষ নিঃস্বাস ত্যাগ করেন।

মহান আল্লাহতায়ালা তাকে বেহেস্ত নসিব করুন।আমিন।